তিপ্রা মথায় আভ্যন্তরীণ অসন্তোষ

তিপ্রা মথায় আভ্যন্তরীণ অসন্তোষ!

সুপ্রিমোর দ্বৈত ভূমিকায় বিভাজিত তিপ্রা মথা!

রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দল তিপ্রা মথার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও বিভেদের বাতাবরণ এতটাই গভীর যে, একাধিক বিধায়ক এবং হেভিওয়েট নেতা এখন দলের সুপ্রিমোর সাথে মঞ্চ শেয়ার করতেও অনিচ্ছুক। এই অসন্তোষের সূত্রপাত বেশ কিছুদিন আগেই হয়েছিল, তবে সম্প্রতি তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানী আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে অনুষ্ঠিত তিপ্রা মথার যুব সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই অসন্তোষের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং প্রবীণ নেতা এই কর্মসূচি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। বিশেষ করে দলের এক মহিলা বিধায়কসহ একাধিক নেতা এখন সুপ্রিমোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন।

তবে তিপ্রা মথার অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন নয়। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই এই অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। মূলত প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি নিয়েই দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। দলের সর্বমোট ৪২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণার সময় সুপ্রিমোর একক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়েছিল, যা অনেক প্রবীণ নেতারই পছন্দ হয়নি। তাঁদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা বহু যোগ্য নেতাকে উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল।

বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপির সঙ্গে তিপ্রা মথার রাজনৈতিক মধুচন্দ্রিমা শুরু হয়। যদিও এই জোট নিয়েও দলীয় অন্দরে বিরোধিতা ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিতর্ক আরও বাড়ে, যখন দলের প্রবীণ নেতাদের উপেক্ষা করে বহিরাগত এক ব্যক্তিকে বিজেপির পদ্ম চিহ্নে প্রার্থী করা হয়। অনেকেই অভিযোগ তোলেন, এই প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দলের মূল দাবিগুলোকেই বিসর্জন দিতে হয়েছিল। তখন থেকেই দলের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছিল, যা এখন প্রকাশ্যে আসছে।

দলের আরও একাংশের অভিযোগ, দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে “তিপ্রাসা চুক্তি” নিয়ে আলোচনায় এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের বেশিরভাগ প্রবীণ নেতাকে এই আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। এতে অনেকেই মনে করছেন, সুপ্রিমো নিজেই একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে একতরফা নীতি অনুসরণ করছেন।

দলের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, যদি বিজেপির বিরুদ্ধে এতটাই ক্ষোভ থাকে, তাহলে কেন তিপ্রা মথা এখনো বিজেপির সঙ্গে সরকারে রয়েছে? কেন দলের সুপ্রিমো সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগ করে আন্দোলনের পথ বেছে নিচ্ছেন না? এই বিষয়ে দলের এক বিধায়ক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “বিজেপির বিরুদ্ধে যদি সত্যিই এত ক্ষোভ থাকে, তাহলে বিজেপির সঙ্গে সরকারে থাকার কোনো অর্থ নেই। সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়ুন।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিপ্রা মথা একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের উপেক্ষা করে যুব সংগঠনের উপর নির্ভর করে রাজনীতির চাল চেলে যাচ্ছেন সুপ্রিমো, এমন অভিযোগ দলের ভেতরেই উঠেছে। একদিকে বিজেপির সঙ্গে সরকারে থাকা, অন্যদিকে বিজেপির বিরোধিতা করা—এই দ্বৈত ভূমিকা আদৌ দলের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তিপ্রা মথার এই ভাঙন ভবিষ্যতে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দল কি আদৌ ঐক্যবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও বড় ভাঙনের দিকে এগোবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।About Us