বিনিয়োগকারীদের রাজ্যে টানতে মুখ্যমন্ত্রীর মুম্বাই ছুট

বিনিয়োগকারীদের রাজ্যে টানতে মুম্বাই ছুটে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী!

উত্তর পূর্বের রাজ্য ত্রিপুরায় বিভিন্ন প্রকল্প স্থাপনের বিষয়ে এগিয়ে আসার জন্য বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। এজন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি। সোমবার মুম্বাইয়ের কোলাবায় তাজমহল প্যালেস হোটেলে উত্তর-পূর্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রোড শোতে বক্তব্য রাখার সময় এবিষয়ে গুরুত্ব তুলে ধরেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, মুম্বাইয়ে রোড শো আয়োজন করায় আমি এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। উত্তর পূর্বাঞ্চলে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি করতে কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রক বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির বিকাশে বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উত্তর পূর্বাঞ্চলকে অষ্টলক্ষী হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। এই অঞ্চলের উন্নয়নে অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি ঘোষণা করেছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলেরই একটি রাজ্য ত্রিপুরা, যেটা বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম সীমান্ত বেষ্টিত রয়েছে। পূর্বাংশে রয়েছে আসাম ও মিজোরাম রাজ্য। এটা দেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের মধ্যে জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। ত্রিপুরার রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি সংস্কৃতি। ত্রিপুরা দেশের মধ্যে এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলে অন্যতম শান্তিপূর্ণ রাজ্য। এখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুত রয়েছে, যা একে উদ্বৃত্ত শক্তির জোগান দেয়। ত্রিপুরার অর্থনীতি প্রাথমিকভাবে কৃষি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।

মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, ২০২৪ সালে রাজ্যের আনুমানিক মাথাপিছু আয় সর্বোচ্চ ১.৭৭ লক্ষ টাকা, যা ২০২৩ সালে ১.৫৭ লক্ষ টাকা ছিল। ত্রিপুরার জিএসডিপি ৮.৯% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উত্তর পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জিএসডিপি বৃদ্ধির হার। আমরা রাজ্যের সামর্থ্য ও সম্পদকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি বিনিয়োগকারী বান্ধব পরিবেশ তৈরি করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সারা রাজ্যে শিল্প ও মৌলিক পরিকাঠামো উন্নয়নে প্রয়াস জারি রেখেছে রাজ্য সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিরা মডেল দিয়েছেন আমাদের। এজন্য যোগাযোগ ক্ষেত্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। হাইওয়ে, ইন্টারনেট, রেলওয়ে এবং এয়ারওয়েতে প্রভূত উন্নতি হয়েছে রাজ্যে। মহারাজা বীর বিক্রম (এমবিবি) বিমানবন্দরকে আপগ্রেড করা হয়েছে, যা এটিকে এই অঞ্চলের দ্বিতীয় ব্যস্ততম ও আকর্ষণীয় বিমানবন্দরে পরিণত করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় রাজ্য সরকার দক্ষিণ জেলার প্রান্তিক শহর সাব্রুমে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) গড়ে তুলেছে, যা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের আকর্ষন বাড়িয়েছে। রাবার, বাঁশ, প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃষিজাত পণ্য, আগর, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চা, হস্তশিল্প এবং পর্যটনের মতো দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করে শিল্পের জন্য প্রচুর সুযোগ রয়েছে ত্রিপুরায়। আমাদের উত্তর জেলায় ২,০০০ হেক্টর জুড়ে ৫ মিলিয়নেরও বেশি আগর গাছ রয়েছে। আমরা বোধজংনগরে একটি রাবার পার্ক স্থাপন করেছি। আর একটি দক্ষিণ জেলায় পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ত্রিপুরায় ২১ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে এবং একটি ব্যাম্বো পলিসি চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উদ্যান জাতীয় ফসলের জন্য যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে ত্রিপুরার। যেমন কুইন আনারস, যাকে রাজ্য ফল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এটি জিআই ট্যাগ পেয়েছে। পর্যটন ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে রাজ্যে। আর পর্যটন শিল্পে ক্রমশ বিভিন্ন বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে যাচ্ছে ত্রিপুরা। পর্যটকের সংখ্যা এখন দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে ত্রিপুরায়। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও অন্যতম শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ত্রিপুরা। এখানে ই-অফিস এবং ই-ক্যাবিনেটের মতো অসাধারণ উদ্যোগ চালু করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা, ডোনার মন্ত্রকের সচিব চঞ্চল কুমার, যুগ্ম সচিব মোনালিসা দাস সহ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকগণ। এর পাশাপাশি এই সামিটে অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট উদ্যোগপতি, শিল্পপতি সহ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিগণ।About Us

অবহেলায় এলবার্ট এক্কার স্মৃতি স্তম্ভ

অনাদরে আর অবহেলায় ডুকলির এলবার্ট এক্কার শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ!

অনাদরে অবহেলায় বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ এলবার্ট এক্কার শহীদ স্মৃতি স্তম্ভটি। আগরতলার ডুকলির ইচাবাজার সংলগ্ন স্টেট ব্যাংকের সামনেই রয়েছে এই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভটি। এখানেই শহীদ জওয়ান এলবার্ট এক্কার অন্তেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। সেনাবাহিনীর ১৪ গার্ড রেজিমেন্টের ল্যান্স নায়েক ছিলেন অ্যালবার্ট এক্কা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এলবার্ট এক্কা সহ ১২ জনের স্মরণে শ্রীপল্লি এলাকায় তাদের কবরস্থানে গড়ে উঠে শহীদস্মৃতি ফলকটি৷ স্থানীয় বাসিন্দা দিলীপ সরকারের দেওয়া জমিতে একটি সৌধ নির্মিত হয়েছিল। আগে এই এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ভুবন দাসের উদ্যোগে এখানে ছোট অনুষ্ঠান হত। করোনাকালে ভুবন দাস প্রয়াত হওয়ার পর এখন ফুল মালা দেওয়ার কেউ নেই।

২০২০ সালে শহীদ জওয়ান এলবার্ট এক্কার পরিবার রাজ্যে এসে ওই এলাকার মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ছিলেন এক্কার স্ত্রীও৷ দেখা করেছিলেন সেই সময়ের রাজ্যপাল তথাগত রায়ের সাথে। এলাকাটি সংরক্ষণ করার দাবী জানিয়েছিলেন। অ্যালবার্ট এক্কার শহীদ স্মৃতিস্তম্ভকে আরো সুন্দর করা এবং এই এলাকাকে কিভাবে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা যায় তার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে ভাবনাচিন্তা করার দাবি করেছিলেন। আজ পর্যন্ত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে এলাকাটি। সোমবার বাংলাদেশ বিজয় দিবস উদযাপনে যখন এলবার্ট এক্কা পার্কে রাজ্যপাল থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর পদস্থ আধিকারিকরা তার স্মৃতিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করছেন। তখন অনাদরে অবহেলায় রয়েছে ডুকলির এলবার্ট এক্কার শহীদ স্তম্ভটি।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ওই এলাকায় কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি। এমনকি সেনাবাহিনীর কোন পদস্থ আধিকারিকরা শহীদ স্তম্ভে গিয়ে মাল্যদান করার সময় পেলেন না। অ্যালবার্ট মরণোত্তর পরমবীর চক্র পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্মৃতিতে গড়া সৌধটি রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি উদ্যোগ কার্যত দেখা যায়নি। এলাকার যুবক ভুবনই যুদ্ধের পর থেকে সৌধটিকে আগলে রেখেছিলেন। বিহারের (অধুনা ঝাড়খন্ড) গুমলাতে জন্মগ্রহণ করেন আদিবাসী তরুণ অ্যালবার্ট এক্কা। প্রায় একা হাতে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে ‘গঙ্গাসাগরের যুদ্ধে’ পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন। তবে যুদ্ধে ৩ ডিসেম্বর শহীদ হন তিনি। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ খেতাবের নাম ‘পরম বীর চক্র’। যুদ্ধে অসম সাহসিকতার জন্য পরে এক্কাকে সেই বিরল সম্মানে (মরণোত্তর) স্বীকৃতি জানানো হয়েছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে মাত্র ২১ জন সেনা এই সম্মান পেয়েছেন। ল্যান্সনায়েক অ্যালবার্ট এক্কা তাদেরই একজন।

একাত্তরের যুদ্ধে ভারত তার পূর্ব ও পশ্চিম– উভয় সীমান্তেই লড়েছিল আর তার মধ্যে পূর্ব রণাঙ্গনে মাত্র একজনই পরম বীর চক্র পেয়েছেন। তিনিই অ্যালবার্ট এক্কা। শহীদ জওয়ানদের স্মৃতিতে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আগরতলার ডুকলিতে হত স্মরণ সভা। বিশেষ কিছু আড়ম্বর করে নয়। এলাকার মানুষজন ঐ সৌধে ফুল মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ‘৭১র যুদ্ধে প্রান দেওয়া সেই বীরদের। ১৬ ডিসেম্বরের আগে তারাই পরিষ্কার করে রাখতো নিজেদের গড়া সৌধটি। কিন্তু এলাকার ভুবন দাসের মৃত্যুর পর উৎসাহ হারিয়ে গেছে। কিন্তু রাজ্য সরকার বা ভারত সরকার কারোর পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সেই স্মৃতি সৌধটিকে সংরক্ষণ করে রাখার, বা প্রতি বছর সেখানে কোন অনুষ্ঠান করার।

এলাকার মানুষ দাবি করেছিলেন অন্তত এই স্মৃতি সৌধটি অধিগ্রহণ করুক সেনাবাহিনী। প্রথম দিকে সেনা বাহিনী তাতে রাজিও হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই উদ্যোগ আর বেশী দূর এগোয়নি। অথচ সেবারের যুদ্ধে ত্রিপুরার অবদান অনেকেই সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন। ১৩ লক্ষ মানুষের ত্রিপুরা সেদিন আশ্রয় দিয়েছিল ১৬ লক্ষ বাংলাদেশি উদ্বাস্তুকে। অথচ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে ত্রিপুরায় হয় না কোন বড় ধরণের অনুষ্ঠান। অবহেলায় আর আনাদরে থাকে এলবার্টের শহীদ ফলকটি৷ মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পরে সেনাবাহিনী এই স্মৃতিসৌধটির চারপাশে সৌন্দর্যায়নের কাজ করেছে। উপরে শেড নির্মান করা হবে। চলছে ইট, বালি, সিমেন্টের গাধুনির কাজ । এলবার্ট এক্কার শহীদ স্মৃতি ফলকটি যখন অনাদরে, অবহেলায় তখন এলবার্ট এক্কা পার্কে সোমবার সকালে শ্রদ্ধা জানান রাজ্যপাল ইন্দ্র সেনা রেড্ডি নাল্লু।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আগরতলা লিচুবাগানস্থিত অ্যালবার্ট এক্কা পার্কে শহীদ বেদীতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু। সেনাবাহিনীর ৫৭ নং মাউন্টেন আর্টি ব্রিগেডের উদ্যোগে আয়োজিত সাইকেল রেলির ও উদ্বোধন করেন তিনি। উপস্থিত ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা, ব্যাটেলিয়ানের মেজর জেনারেল সমীর চরণ কার্তীকেয়ন সহ সেনাবাহিনী জওয়ানরা। মহান বিজয় দিবস সম্পর্কে রাজ্যপাল বলেন ১৯৭১ সালের এই দিনেই বাংলাদেশ পাশে দাঁড়িয়ে ভারতীয় জওয়ানরা পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করেছে।

ভারতীয় জওয়ানদের আত্ম বলিদানের এই ইতিহাস কে স্মরণ করে তিনি তাদের ও পরিবার বর্গের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। সেই সময়ে ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানে জওয়ানরা গান স্যালুট দেন। এখন দেখার বিষয় এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি অনাদরে ও অবহেলায় একইভাবে পড়ে থাকবে, নাকি এই অবহেলা কাটিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি তাঁর প্রকৃত সম্মানটুকু অর্জন করবে।About Us

জাকির হোসেন সংগীত জগতের এক অমর নাম!

ভারতের বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে জাকির হোসেন এক অমর নাম!

উস্তাদ জাকির হোসেন, সংগীতের মূর্ছনায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একজন মৃদঙ্গবাদকই নন, একজন উদ্যমী সঙ্গীতজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক, এবং বিশ্বের শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি প্রভাবশালী নাম। বিশ্বজুড়ে তাঁর অসংখ্য অনুরাগী, শ্রোতা ও সঙ্গীতপ্রেমী রয়েছেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে জাকির হুসেন তাঁর অসামান্য প্রতিভা ও সৃজনশীলতায় মুগ্ধ করেছেন হাজার হাজার শ্রোতাকে।

ভারতের বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ মৃদঙ্গবাদকরা স্থান পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে জাকির হুসেন এক বিশেষ স্থান অধিকার করেন। তাঁর বাজানো মৃদঙ্গা এক ধরনের যাদু, যা সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সাথে মিশিয়ে, তিনি এক নতুন ধরনের সঙ্গীতশৈলী তৈরি করেছেন, যা বিশ্বের মঞ্চে বিশেষভাবে প্রশংসিত। 

জাকির হোসেনের প্রথম জীবন এবং শৈশবকাল

১৯৫১ সালের ৯ই মার্চ, মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন জাকির হুসেন। তাঁর পরিবার ছিল সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাবা উস্তাদ আলী আকবর খান ছিলেন একজন খ্যাতনামা সেতারবাদক এবং মা, মা জাওয়াদ সুলতান খান, ছিলেন একজন গায়িকা। এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্ম নেয়।

জাকির হুসেনের শৈশবকাল অতিবাহিত হয় সংগীত এবং সংস্কৃতির মধ্যে। তিনি মাত্র ৭ বছর বয়সে মৃদঙ্গা বাজানো শুরু করেন। তাঁর প্রথম গুরু ছিলেন উস্তাদ উমীরান খান, যিনি তাঁকে মৃদঙ্গার মৌলিক কৌশল শেখান। এই সময়ে জাকির হুসেন সংগীতের মূল ধারাগুলি শিখে নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করতে থাকেন। তবে, তাঁর সংগীত জীবনের মূল যাত্রা শুরু হয় যখন তিনি শ্রী গুরুজি উস্তাদ আলি আকবর খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা শিখতে শুরু করেন।

জাকির হোসেনেরশিক্ষা এবং প্রাথমিক সংগীত জীবনের সূচনা

জাকির হুসেনের সংগীতজীবনের প্রথম দিক ছিল অত্যন্ত সৃজনশীল এবং চ্যালেঞ্জিং। তিনি শুধু মৃদঙ্গা নয়, আরও অনেক ধরনের তালের উপরে গবেষণা করেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। সেই সময়ে তিনি অন্যান্য মৃদঙ্গবাদকদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শুরু করেন, এবং সংগীতের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করেন। একের পর এক কনসার্টের মাধ্যমে তিনি খুব দ্রুত পরিচিত হতে শুরু করেন। তাঁর মৃদঙ্গার অনন্য ধরন, স্বতন্ত্র বাজানোর স্টাইল এবং তালে নিখুঁত কমপোজিশন তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক নক্ষত্র করে তোলে। তাঁর বাজানো মৃদঙ্গা ছিল এক ধরনের মন্ত্রমুগ্ধকারী শক্তি, যা শ্রোতাদের এক নতুন সঙ্গীত দুনিয়ায় নিয়ে যেত।

বিশ্ব মঞ্চে জাকির হুসেন: আন্তর্জাতিক পরিচিতি

জাকির হুসেনের মৃদঙ্গা শুধুমাত্র ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও প্রশংসিত হয়েছে। তিনি একাধিক পশ্চিমা শিল্পী, যেমন জন ম্যাকলফিন, জর্জ হ্যারিসন, পল সাইমন, রীতভব নাগার, এবং হেনরি কপার এর সঙ্গে বিভিন্ন জ্যাজ এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মিশ্রণে বহু কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পশ্চিমা সংগীতের ঐতিহ্যকে মিশিয়ে এক নতুন সংগীতধারা সৃষ্টি করেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর কনসার্টগুলি প্রশংসিত হয়। তাঁকে বিভিন্ন দেশে সংগীতের অন্যতম মুখ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে নতুন ধারার সঙ্গীত তৈরি করার জন্য তিনি ‘হোমল্যান্ড’ নামে একটি ব্যান্ডও গঠন করেন, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এর মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং বিশ্ব সংগীতের মধ্যে এক সেতুবন্ধন স্থাপন করেন। জাকির হুসেন একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তাঁর নিবিড় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, তেমনি অন্যদিকে তিনি নতুন সঙ্গীতধারার দিকে অগ্রসর হয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, সঙ্গীত কোন দেশের সীমা বা জাতি-ধর্মের বিষয় নয়; এটি একটি সার্বজনীন ভাষা, যা মানুষের মনোজগতকে একত্রিত করে। তিনি ভারতীয় মৃদঙ্গাকে শুধু শাস্ত্রীয় গানের পরিবেশে নয়, আন্তর্জাতিক সঙ্গীত মঞ্চেও তুলে ধরেছেন।

তাঁর বাজানো মৃদঙ্গা বিশ্বজনীন সংগীতের অংশ হয়ে উঠেছে। একটি বিশেষ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তাঁর ‘গ্রেট কনসার্ট’ শিরোনামের অনুষ্ঠান, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে একত্রে পরিবেশন করেন। এই অনুষ্ঠানটি সারা বিশ্বে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাকির হুসেনের বাজানোর ধরন ছিল সম্পূর্ণ মৌলিক এবং তাঁর সৃষ্টির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সঙ্গীতধারা রয়েছে। তিনি মৃদঙ্গা বাজানোর সময় প্রতিটি তালের সাথে নির্দিষ্ট এক ধরনের সুর মিলিয়ে একটি ভিন্নধর্মী অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশন তৈরি করতেন। তাঁর বাজানোতে ছিল নিখুঁত তালের সাথে সংগীতের সূক্ষ্মতা এবং অনুপুঙ্খতা। তিনি বিশেষভাবে তালের বিভিন্ন প্রকৃতির উপর কাজ করেছেন এবং প্রতিটি তালের বিশেষত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বাজানোর শৈলী ছিল অত্যন্ত সৃজনশীল, যেখানে তিনি কখনও তালে পরিবর্তন, কখনও সুরের সঙ্গে খেলা, কখনওবা নিঃশব্দতা সৃষ্টি করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।

তাঁর এই বিশাল প্রতিভার জন্য তিনি ভারত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। জাকির হুসেন তার সংগীত জীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৯০ সালে তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান, পদ্মশ্রী, এবং ২০০২ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর অসামান্য সঙ্গীতকর্মের জন্য তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেছেন। এ ছাড়া তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অবদানের জন্য একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাকির হুসেনের কাজ শুধু তার মৃদঙ্গার জন্যই নয়, তাঁর সংগীতের নতুন ধারার জন্যও সমাদৃত। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক মহান আদর্শ স্থাপন করেছেন।

জাকির হুসেনের সঙ্গীত যাত্রা একটি অনুপ্রেরণা, যা মৃদঙ্গা বাজানোর শুধুমাত্র কৌশল নয়, বরং সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বকে একত্রিত করার একটি উদাহরণ। তাঁর মৃদঙ্গার সুরে, তালে এবং সৃজনশীলতার মাঝে বিশ্বের এক অমূল্য ধন রূপে শোভিত হয়েছে। তাঁর অবদান আজীবন শংসনীয় এবং তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম মহান শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।About Us